মোঃ সোহাগ ইসলাম, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধিঃ
ঠাকুরগাঁও শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের গোলচত্বরে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্বাচনী প্রচারণার ব্যানার, ফেস্টুন ও বড় বড় বিলবোর্ডে প্রায় পুরোপুরি আড়াল হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত এই স্তম্ভ ঢেকে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রচারণার সামগ্রী সরিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি দৃশ্যমান রাখতে হবে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী) আসনটি গত ২২ আগস্ট শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৯ অক্টোবর এ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতীক বরাদ্দের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাত থেকে শহরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড টাঙানো শুরু হয়। পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের গোলচত্বরেও প্রথমে বিএনপির সমর্থকেরা ব্যানার টাঙান। এতে স্মৃতিস্তম্ভটির একাংশ আড়াল হয়ে যায়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে গোলচত্বরের ফাঁকা জায়গায় জামায়াতের কর্মীরা ব্যানার টাঙানোর পাশাপাশি বড় বড় বিলবোর্ড স্থাপন করেন। এতে স্মৃতিস্তম্ভটির প্রায় পুরো অংশই আড়ালে পড়ে যায়।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব স্মরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ৬৪ জেলায় একই নকশায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। এসব স্তম্ভে জুলাই আন্দোলনের স্লোগান, গ্রাফিতি ও কবিতা খোদাই করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস তুলে ধরাই এসব স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্দেশ্য।
ঠাকুরগাঁওয়ে জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহছানুল হাবিব বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ অভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে। যারা স্তম্ভটি ঢেকে দিয়েছেন, তাঁদের সতর্ক থাকা উচিত। এই স্মৃতিস্তম্ভের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
গোলচত্বর পার হওয়ার সময় স্মৃতিস্তম্ভটির এমন অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সালন্দর এলাকার বাসিন্দা আবুল হায়াত। তিনি বলেন, “যে জুলাই অভ্যুত্থানের জন্য আমরা এই নির্বাচন পেলাম, সেই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটাই ব্যানার-বিলবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিলাম। এতে বোঝা যায়, জুলাই বিপ্লব আমাদের মুখে থাকলেও আসলে বুকে নেই।”
মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, যেসব শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে মানুষ আজ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে, তাঁদের স্মৃতিই নির্বাচনী প্রচারণার কারণে আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর জাতীয় কমিটির ঠাকুরগাঁওয়ের সদস্যসচিব মাহবুব আলম বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার কথা বললেও প্রচারণার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে দেওয়া প্রত্যাশিত নয়। ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি দৃশ্যমান রাখার দাবি জানান তিনি।
সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুলহ আল মামুন বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিযোগিতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো রাজনৈতিক দলের ব্যানার-বিলবোর্ডে ছেয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ।
বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা সেলের দায়িত্বে থাকা জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আহমেদুর রহমান কাজল বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান তাঁদের হৃদয়ে রয়েছে, এটি ভোলার নয়। প্রচারণার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা না বুঝেই স্তম্ভের সামনে ব্যানার টাঙিয়েছেন। তাঁদের ব্যানার টাঙানোর পরও স্তম্ভটি অনেকটাই দৃশ্যমান ছিল। তবে জামায়াত ফাঁকা জায়গাটুকুতে ব্যানার-বিলবোর্ড লাগিয়ে স্তম্ভটি ঢেকে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের প্রচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, গোলচত্বরে ফাঁকা জায়গা না পাওয়ায় প্রচারণার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সেখানে ব্যানার-বিলবোর্ড স্থাপন করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে স্থাপন করা ধানের শীষের ব্যানার সরিয়ে নেওয়া হলে তাঁরাও দাঁড়িপাল্লার ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে নেবেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরে স্থাপন করা ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে বলে জানান তিনি।


















