সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি জি এম রাজু আহমেদ
সাতক্ষীরার শ্যামনগর পৌরসভা বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৌরসভা গঠনের ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত কর-ফি’র চাপ এবং নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি বেড়েছে—এমন অভিযোগ তুলে পৌরসভা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় শ্যামনগর পৌরসভার সোনার মোড় মাছের সেট সংলগ্ন এলাকায় শ্যামনগর উপজেলা নাগরিক ফোরামের আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
পৌরসভা বাতিলের দাবি মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শ্যামনগর একটি প্রান্তিক জনপদ। পৌর এলাকার বড় একটি অংশ এখনো গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চল। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি, মৎস্য, শ্রম ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। এমন বাস্তবতায় পৌরসভা গঠনের পর সাধারণ মানুষের ওপর পৌরকর, বিভিন্ন ফি ও অন্যান্য আর্থিক দায় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, নাগরিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সেবা পেতে সময়ও বেশি লাগছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।
বক্তারা আরও দাবি করেন, পৌরসভা গঠনের সময় এলাকার জনসংখ্যা, কৃষি ও অকৃষি জমির পরিমাণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা পুনরায় তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, ভুরুলিয়া ইউনিয়নের একটি বড় অংশ এবং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে।
‘উন্নয়নের নামে দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ নয়’
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে শ্যামনগর উপজেলা উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক গাজী আশরাফুজ্জামান বলেন, শ্যামনগরের অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী, কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত কর ও ফি-এর চাপ সৃষ্টি করে কোনো উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত নয়।
তিনি বলেন, “আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। কিন্তু এমন উন্নয়ন চাই না, যার বোঝা দরিদ্র মানুষের কাঁধে চাপবে। শ্যামনগরের বাস্তবতা ও মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে পৌরসভা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
গাজী আশরাফুজ্জামান আরও বলেন, সাতক্ষীরার মতো পুরোনো একটি শহরেও এখনো নাগরিক সেবা, ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। সেখানে শ্যামনগরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় পৌর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সব ধরনের নাগরিক সেবা টেকসইভাবে নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
তিনি অভিযোগ করেন, পৌরসভা হওয়ার পর নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও অন্যান্য সেবা নিতে ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
গাজী আশরাফুজ্জামান বলেন, “শ্যামনগরবাসী এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চায়। তাই জনগণের প্রাণের দাবি হিসেবে আমরা শ্যামনগর পৌরসভা বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।”
তিনি জানান, পৌরসভা বাতিলের দাবিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে কার্যক্রম চলছে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
‘নগরপিতা হওয়ার লোভে পৌরসভা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে’—মাসুম বিল্লাহ
মানববন্ধনটি পরিচালনা করেন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শ্যামনগরে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অন্যতম মাস্টার মাসুম বিল্লাহ।
বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করে বলেন, “বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে বিনা ভোটের এমপি জগলুল হায়দার ও বিনা ভোটের চেয়ারম্যান জহুরুল হায়দার পরিকল্পিতভাবে নগরপিতা হওয়ার লোভে এই বোঝা শ্যামনগরের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, পৌরসভা গঠনের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর কর ও বিভিন্ন ফি-এর চাপ বেড়েছে। জনগণের মতামত এবং এলাকার আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনার দাবি জানান তিনি।
উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ
মানববন্ধনে মাজট-কাশিপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মুক্তার আলীসহ স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, শ্যামনগর পৌরসভা বাতিল করা এখন স্থানীয় জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পৌরসভা বাতিলের দাবিতে এর আগে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন ও দলিল লেখকদের কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। একই দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হয়েছে বলেও তারা জানান।
মানববন্ধন থেকে শ্যামনগর পৌরসভা বাতিল করে জনগণকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও নাগরিক ভোগান্তি থেকে মুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানানো হয়।


















