বাকেরগঞ্জ(বরিশাল)প্রতিনিধি:
ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। বরিশালের উপকূলীয় গ্রামের এক বাসিন্দা। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে তিনি প্রথমে আকাশের দিকে তাকান! আমরা অনেকেই আকাশ দেখি সৌন্দর্যের জন্য।
তিনি দেখেন দুশ্চিন্তা নিয়ে। কালো মেঘ মানে তাঁর কাছে সম্ভাব্য বিপদ। হঠাৎ জোরে বাতাস তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে অনিশ্চয়তার। নদীর ফুলে ওঠা পানি মানে শুধু জোয়ার নয়, ঘর হারানোর আশঙ্কা। প্রকৃতি এখানে জীবন, জীবিকা, ভয়, আশা এবং ভবিষ্যতের আরেক নাম।
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিভিন্ন অঙ্গীকার করা হয় এ দিনে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future” যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য”- স্লোগানে পালন করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি হওয়া সত্বেও বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি। উপকূলে জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে, লবণাক্ততা বিস্তার লাভ করছে, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিচ্ছে। তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্বও বেড়েছে মারাত্মকভাবে।
উপকূলীয় এলাকায় কাজ করতে গিয়ে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর গত কয়েক বছরে অনেক কঠিন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা নজরে এসেছে। ‘নিরাপদে ভাসা’ প্রকল্পের মাধ্যমে সিআইপিআরবি জানার চেষ্টা করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু। এ ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘদিন ধরে আঁচল ( শিশু যত্নকেন্দ্র) এবং সুইমসেফ (জীবন রক্ষাকারী সাঁতার শিক্ষা) ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার শিশুর পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু উপকূলের বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের ওপর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, ধারাবাহিক এবং আন্তঃসম্পর্কিত। একটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি কিংবা আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে অনেক সময় কাঁচা রাস্তা ডুবে যায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। আঁচল কেন্দ্রগুলো নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারগুলো তখন জীবিকা রক্ষা, ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। শিশুদের ওপর নজরদারি কমে যায়। চারপাশে জমে থাকা পানি, প্লাবিত জমি, খাল, ডোবা কিংবা পুকুর নতুন বিপদের উৎস হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তীব্র তাপদাহ এবং বিভিন্ন রোগেও শিশুরা এসব সুরক্ষাসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
“প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা” বলতে আমরা প্রায়ই বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা পরিবেশ সচেতনতার কথা বুঝি। অবশ্যই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃতি থেকে শেখার অর্থ আরও বিস্তর- পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বোঝা, ঝুঁকিগুলোকে নতুনভাবে চিহ্নিত করা এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে সমাধান তৈরি করা।
উপকূলের মানুষ বরাবরই প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সেই অভিযোজনের ধারণাকেই শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে।
জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মধ্যেও কীভাবে শিশু সুরক্ষা ও পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কার্যক্রম সচল রাখা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইন্সটিটিউশন (RNLI) ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআইপিআরবি। মাঠপর্যায়ে সফলতা পাওয়া গেলে এসব অভিজ্ঞতা দেশব্যাপী প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সমন্বিত শিশু সুরক্ষা ও বিকাশ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পরিচালিত আইসিবিসি প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। এই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিশু সুরক্ষার সম্পর্ককে নীতিগতভাবে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো এটাই—আমরা কি শুধু প্রকৃতির ক্ষতি কমানোর কথা ভাবব, নাকি প্রকৃতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় মানুষের জীবন বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও ভাবব?
উত্তরটি হয়তো উপকূলের সেই মায়ের কাছেই আছে, যিনি প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রকৃতি আজও আমাদের শেখাচ্ছে। প্রশ্ন হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
লেখক:
মোঃ আবুল বরকাত
উপ-পরিচালক, সিআইপিআরবি














